সচিবালয় হয়ে ওঠে ‘দ্রোহকেন্দ্র’
- আপডেট এর সময় : ০৩:০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৫
- / 139
স্বৈরাচার পতনের পর দেশজুড়ে চলছে নাশকতার অপচেষ্টা। বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিরতা সৃষ্টির
অপচেষ্টা চালায় আওয়ামী দোসরা। বিভিন্ন দাবি নিয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রেণি-পেশার মানুষের
নজিরবিহীনভাবে সচিবালয়ে ঢুকে পড়া দেশকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। বছরের শেষ সপ্তাহে প্রশাসনের
প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে আগুনের ঘটনা সৃষ্টি করেছে নতুন বিতর্ক।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কয়েক সপ্তাহজুড়ে
কর্মদিবস এলেই কোনো না কোনো দাবি নিয়ে সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে বিক্ষোভ হতে দেখা গেছে।
গত ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর পর তাদের প্রথম কর্মদিবস ১১ অগাস্ট
থেকেই প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
পদোন্নতি, বদলি ঠেকানো, চাকরি স্থায়ীকরণসহ নানা দাবি নিয়ে বিক্ষোভ-মিছিল ও অবস্থান
কর্মসূচি দেখা গেছে। এতে করে সচিবালয়ে কর্মরত কর্মচারী-কর্মকর্তারা ভেতরে প্রবেশ ও বের
হতেই হিমশিম খেয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৯ আগস্ট থেকেই ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়
সচিবালয়কেন্দ্রিক মিছিল, বিক্ষোভ ও অবরোধ। সচিবালয় একটি কেপিআই অবকাঠামো। তার ভেতরে
৯ আগস্ট থেকে বৈষম্যবিরোধী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী ব্যানারে নিয়মিত বিক্ষোভ শুরু হয়।
তাদের দাবি ছিল, বিগত ১৫ বছর শেখ হাসিনা সরকারের সময় তারা পদোন্নতি বঞ্চতি হয়েছেন, ভোগ
করতে পারেননি সুযোগ-সুবিধা।পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল প্রতিরোধের সুযোগে
একজোট হয়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করে মিছিল করে। উপদেষ্টা, সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-
কর্মচারীরা সচিবালয়ে প্রবেশ ও বের হতে বিপদের মুখে পড়েন।
গত ১১ আগস্ট সকাল থেকে সচিবালয়ের পশ্চিম পাশের ফটকে নার্স ও মিডওয়াইফরা অবস্থান নেন।
বদলির হয়রানি দূর করা এবং বদলির ক্ষমতা মন্ত্রণালয় থেকে নার্সিং অধিদপ্তরে ফেরত নেওয়ার
দাবি ছিল তাদের। সমাবেশের মাঝে সচিবালয়ের ফটকের সামনে বসে চলে খাওয়া-দাওয়া।
প্রতিবন্ধীদের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুমোদন দেওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক
হাজার শিক্ষক এমপিওভুক্তির দাবিতে সচিবালয়ের গেটে অবস্থান নেন।তাদের ভাষ্য ছিল- প্রতিবন্ধী
শিক্ষার্থীদের জন্য সারা দেশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ হাজার ৭৭২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে তাদের জন্য একটা বিশেষ নীতিমালা করা হয়। সে অনুযায়ী তারা স্কুল
প্রতিষ্ঠা করেন। মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি স্কুলের পরিদর্শন কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এগুলোর
এমপিও হয়নি, ফলে শিক্ষকরা কোনো বেতন পান না। এই প্রহসন বন্ধ করে ন্যায্য পাওনা বুঝে পেতে
আন্দোলনের নামেন তারা।
বেতন বৈষম্য নিরসন, চাকরি জাতীয়করণসহ চার দফা দাবিতে ১৪ আগস্ট থেকে মানববন্ধন ও
বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বেতন বৈষম্যবিরোধী গ্রাম পুলিশ সমন্বয় কমিটি। পুলিশ সদস্যদের মতো
রেশন ও পেনশন সুবিধার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে গ্রাম পুলিশের সদস্যরা বৈষম্য দূর
করে নায্য বেতনের দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে চলমান এইচএসসি ও সমমানের বাকি বিষয়গুলোর পরীক্ষা বাতিল করে
অটো পাসের দাবি মেনে নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২০ আগস্ট বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ড.
আব্দুর রশিদ দাবি মেনে নেন।২০ আগস্ট সকাল থেকে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো
হন পরীক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে দুপুরের দিকে তারা সচিবালয়ে প্রবেশ করেছিল।
চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে কয়েক দিন ধরে আনসার সদস্যরা রাজপথ অবরোধ করে রাখছিলেন। ২৫
আগস্ট সকাল থেকে তারা সচিবালয় এবং আশপাশের সব ফটকের সামনে অবস্থান নেন। কর্মকর্তা-
কর্মচারীসহ গণমাধ্যমকর্মীরাও ভেতরে ঢুকতে পারেননি। পরে আনসারদের চার সদস্যের
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে তাঁদের দাবি
মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। তখন আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন সমন্বয়ক নাসির মিয়া।এরপরও
সচিবালয় ফটকের অবস্থান নেন আনসার সদস্যরা। একপর্যায়ে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমকে অবরুদ্ধ
করেন তারা।খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো
হন শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁরা সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা করেন। সচিবালয়ের
সামনে আনসার সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষে ধাওয়া
পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সচিবালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে শিক্ষার্থীদের
সঙ্গে জনতাও যোগ দেয়।সংঘর্ষ চলাকালে কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দও পাওয়া যায়। এর মধ্যে এক
শিক্ষার্থীকে রাস্তায় ফেলে আনসার সদস্যদের মারধর করতে দেখা যায়। সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন
আহত হয়েছেন। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশির ভাগই
শিক্ষার্থী। এ ছাড়া আনসার সদস্য এবং সাংবাদিকও রয়েছে। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের
মুখে আনসার সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন। ধাওয়া খেয়ে অনেকেই সচিবালয় এলাকা থেকে পালিয়ে যান।
এর মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক আনসার সদস্যকে ঘিরে ফেলেন শিক্ষার্থীরা। তারা ইউনিফরম খুলে
হাতজোড় করে মাফ চান। পরে সেনাবাহিনী এসে তাঁদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
বছরের শেষ দিকে সচিবালয়ে আগুন ছিলো সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।গত ২৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে
সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে আগুন লেগে ষষ্ঠ থেকে নবম তলায় থাকা পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের দপ্তর
পুড়ে যায়। এর মধ্যে অষ্টম ও নবম তলার অধিকাংশ নথি পুড়ে গেছে।ভয়াবহ এ আগুন নেভানোর কাজ
করতে গিয়ে পানির সরবরাহ লাইন সংযোগ দেওয়ার সময় ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী ট্রাক চাপায়
নিহত হন।
প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা সময় ধরে জ্বলা এ আগুন লাগার পর তা দুর্ঘটনা
না কি নাশকতা সেই আলোচনাও সামনে আসে। সরকারের উপদেষ্টাদের পক্ষ থেকেও ষড়যন্ত্র ও
নাশকতার বিষয়টি সামনে আনা হয়। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত্র ‘বৈদ্যুতিক
গোলযোগ’ থেকে দাবি করা হয়। উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির দাখিল করা প্রাথমিক তদন্ত
প্রতিবেদনে ‘সরকার সন্তুষ্ট’। এরপরও এটি যে দুর্ঘটনা সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হতে কিছু নমুনা
বিদেশে নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।




















