প্রেম থেকে বিরোধ, প্রেমিকার খণ্ডিত লাশ লাগেজে ও বস্তায়
- আপডেট এর সময় : ০৫:৪১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 5
নিজস্ব প্রতিবেদক,মানি লাইন
গাজীপুরের জয়দেবপুরে খাল থেকে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় পাওয়া অজ্ঞাত নারীর দ্বিখণ্ডিত অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্যের জট খুলেছে।
প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে নিয়ে বিরোধ ও পূর্বের ক্ষোভের জেরে ডলি আক্তার (৩০) নামের ওই নারীকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
হত্যার পর পরিচয় গোপন ও লাশ গুম করতে মরদেহ কোমর থেকে দুই টুকরো করে একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নিহতের প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) ও মিশনের বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেফতার করেছে পিবিআই। পুলিশের দাবি,গ্রেফতার তিনজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর মহানগরের রাজদীঘির উত্তর পাড়ে পিবিআই গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।
খালে ভাসছিল সুটকেস-বস্তা
গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকায় হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের একটি খালে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে সুটকেস ও বস্তা উদ্ধার করে। পরে সেগুলোর ভেতর থেকে এক নারীর দ্বিখণ্ডিত ও অর্ধগলিত মরদেহ পাওয়া যায়।ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর মৃত নারীর পরিচয় ও হত্যার রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পিবিআই। ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে।
পাঁচ বছরের সম্পর্কের পর বিরোধ
তদন্তে বেরিয়ে আসে নিহত ডলি আক্তারের পরিচয়। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি জয়দেবপুরের বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। বাঘের বাজার এলাকার গোল্ডেন রিপিট গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
পিবিআই জানায়, একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে মিশন ইসলামের সঙ্গে ডলির পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এ সম্পর্কের একপর্যায়ে বিয়ে নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এ ছাড়া আগের কিছু বিষয় নিয়েও মিশনের মধ্যে ডলির প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যার অভিযোগ
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু অন্য কক্ষে ঘুমাতে গেলে ডলি ও মিশন একই কক্ষে থাকেন।পুলিশের তদন্তে জানা যায়, রাতে ডলিকে ঘুমের ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত আনুমানিক ২টার দিকে মিশন লুঙ্গি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ।
হত্যার পর মরদেহটি চৌকির নিচে রাখা হয়। পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার মরদেহটি দেখতে পান। এরপর মরদেহ সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়।
সুটকেসে না ধরায় মরদেহ দুই টুকরো
পিবিআই জানায়, মরদেহ গুম করার জন্য মিশন একটি সুটকেস সংগ্রহ করেন। কিন্তু পুরো মরদেহ সুটকেসের ভেতরে না ঢোকায় ব্লেড ও বঁটি-দা ব্যবহার করে কোমর থেকে মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করা হয় বলে আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়। পরে মিশন তার বন্ধু মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন এসে সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন।
পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে প্রথমে রাজেন্দ্রপুরের দিকে যান। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ভবানীপুর এলাকায় পৌঁছান। পরে ভবানীপুর ব্রিজের কাছাকাছি গিয়ে মিশন ও মিল্টন সুটকেস এবং বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেন।
পিবিআইয়ের দাবি, সুটকেস ও বস্তা পানিতে ফেলার সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগে। ভেতরে কী আছে জানতে চাইলে মিশন তাকে জানান, সেখানে তার প্রেমিকা ডলি আক্তারের মরদেহ রয়েছে।
দ্রুত শনাক্ত তিনজন
নিহতের বড় ভাই সোহেল (৪৪) গত ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নিয়ে পিবিআই প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে।
ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে মিজানুর রহমান মিল্টনকে গ্রেফতার করা হয়। একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পৃথক একটি ভাড়া বাসা থেকে মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়।পরে আসামিদের দেওয়া তথ্য ও তাদের দেখানো জায়গা থেকে মিশনের ভাড়া বাসা থেকে একটি বটি-দা, মরদেহ প্যাকেটজাত করতে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলির জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি সুটকেস কেনার বিষয়ে তথ্য এবং বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত করা তদন্তের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের সমন্বয়ে নিহতের পরিচয় এবং হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে পাওয়া আলামত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, গ্রেফতার তিন আসামিই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, তা।



















