০৮:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
“ক্ষমতা, বদলি বাণিজ্য

কাস্টমস আরিফুলে উত্থান ও বিতর্কিত সম্পদ সাম্রাজ্য

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ০৯:২৩:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
  • / 1766

এনবিআর কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য ও চোরাকারবারিদের সাথে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সচেতন মহলের সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে কৌশলে ভোল পাল্টে এই কর্মকর্তা বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট এলাকার সূত্র এবং পারিবারিক তথ্যানুযায়ী, মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদরের বত্রিশ এলাকার নূরানী সড়কের ‘ছোবহান ভিলা’ (হোল্ডিং-৯৮০)-এর স্থায়ী বাসিন্দা। তার পিতা মোহাম্মদ আব্দুছ ছোবহান ছিলেন একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক। তিন ভাই ও দুই বোনের বিশাল পরিবারে একসময় সংসার ও লেখাপড়ার খরচ চালাতে চরম টানাপোড়েন পোহাতে হতো।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আরিফুল ইসলাম কাস্টমসে চাকরি পান। কিশোরগঞ্জে ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিগত দিনে ‘ছাত্রলীগ লেবাস’ ব্যবহার করে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা নিলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভোল পাল্টে তিনি বর্তমান কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব পদ বাগিয়ে নেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা কাস্টম হাউসে থাকাকালীন আরিফুল ইসলাম চোরাকারবারি ও প্রভাবশালী আওয়ামী পন্থী ব্যবসায়ীদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি এয়ার ওয়েবিল (Air Waybill – AWB) ছাড়করণের বিপরীতে তিনি ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নিতেন। এভাবে প্রায় ৯০০টি এয়ার বিল থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তার এই বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে সরকারের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একপর্যায়ে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে ঢাকা কাস্টমস থেকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ (জরুরি বদলি) করা হয়েছিল। ঢাকা কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলহোতা হিসেবে তার নাম উঠে আসলেও, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশীর্বাদে তিনি বারবার পার পেয়ে যান। বর্তমানে প্রথম সচিবের পদে বসার পর তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও নতুন ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষকের সন্তান হয়েও আরিফুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
আরিফুলে স্থাবর সম্পদ ও ফ্ল্যাট-জমির বিবরণ:
গ্রামের বাড়ি: কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়াতে প্রায় ১০ বিঘা জমি। মিরপুর হাউজিং: মিরপুরে ৮০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট। মিরপুর পাইকপাড়া: ওয়ার্ড-১১, মৌজা-২৫.৫০ অজুতাংশ জমির ওপর নির্মিত ফ্ল্যাট। উত্তর মেরাদিয়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৩, মৌজা-৮২ অজুতাংশ জমির ওপর দুটি ফ্ল্যাট। উত্তর মেরাদিয়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৩, আড়াই শতাংশ জমির ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন ৫ তলা ভবন। নন্দীপাড়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৭৪, ৩৯ অজুতাংশ জমির ওপর একটি ফ্ল্যাট। কাফরুল: ওয়ার্ড-১৬, ৩৬/২ অংশ জমির ওপর দুটি ফ্ল্যাট। এফডিআর: মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের নিজস্ব নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকার এফডিআর (FDR)। স্বর্ণালঙ্কার: কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৬০ ভরি স্বর্ণ। শেয়ারবাজার ও নগদ টাকা: শেয়ারবাজারে কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি নগদ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ‘ঢাকা মেট্রো-গ ২৮-৩৬৩০’ নম্বরের একটি দামী গাড়ি রয়েছে।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ এই বিশাল সম্পদের খতিয়ান খতিয়ে দেখতে একটি প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সচেতন মহলের দাবি, এই কর্মকর্তার ও তার পরিবারের নামে-বেনামে থাকা সমস্ত অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় বা দুদকীয় অনুসন্ধান প্রয়োজন। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে কাস্টমস প্রশাসনের এই বিতর্কিত কর্মকর্তার দুর্নীতির “থলের বেড়াল” বেরিয়ে আসবে এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা আশা প্রকাশ করেন।

31 October 2026

কাস্টমস আরিফুলে উত্থান ও বিতর্কিত সম্পদ সাম্রাজ্য

আমাদের ফেইসবুক পেইজ

abc

“ক্ষমতা, বদলি বাণিজ্য

কাস্টমস আরিফুলে উত্থান ও বিতর্কিত সম্পদ সাম্রাজ্য

আপডেট এর সময় : ০৯:২৩:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য ও চোরাকারবারিদের সাথে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সচেতন মহলের সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে কৌশলে ভোল পাল্টে এই কর্মকর্তা বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট এলাকার সূত্র এবং পারিবারিক তথ্যানুযায়ী, মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ সদরের বত্রিশ এলাকার নূরানী সড়কের ‘ছোবহান ভিলা’ (হোল্ডিং-৯৮০)-এর স্থায়ী বাসিন্দা। তার পিতা মোহাম্মদ আব্দুছ ছোবহান ছিলেন একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক। তিন ভাই ও দুই বোনের বিশাল পরিবারে একসময় সংসার ও লেখাপড়ার খরচ চালাতে চরম টানাপোড়েন পোহাতে হতো।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আরিফুল ইসলাম কাস্টমসে চাকরি পান। কিশোরগঞ্জে ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিগত দিনে ‘ছাত্রলীগ লেবাস’ ব্যবহার করে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা নিলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভোল পাল্টে তিনি বর্তমান কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব পদ বাগিয়ে নেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা কাস্টম হাউসে থাকাকালীন আরিফুল ইসলাম চোরাকারবারি ও প্রভাবশালী আওয়ামী পন্থী ব্যবসায়ীদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি এয়ার ওয়েবিল (Air Waybill – AWB) ছাড়করণের বিপরীতে তিনি ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ নিতেন। এভাবে প্রায় ৯০০টি এয়ার বিল থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তার এই বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে সরকারের বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একপর্যায়ে মাত্র তিন মাসের মাথায় তাকে ঢাকা কাস্টমস থেকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ (জরুরি বদলি) করা হয়েছিল। ঢাকা কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলহোতা হিসেবে তার নাম উঠে আসলেও, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশীর্বাদে তিনি বারবার পার পেয়ে যান। বর্তমানে প্রথম সচিবের পদে বসার পর তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও নতুন ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষকের সন্তান হয়েও আরিফুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
আরিফুলে স্থাবর সম্পদ ও ফ্ল্যাট-জমির বিবরণ:
গ্রামের বাড়ি: কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়াতে প্রায় ১০ বিঘা জমি। মিরপুর হাউজিং: মিরপুরে ৮০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট। মিরপুর পাইকপাড়া: ওয়ার্ড-১১, মৌজা-২৫.৫০ অজুতাংশ জমির ওপর নির্মিত ফ্ল্যাট। উত্তর মেরাদিয়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৩, মৌজা-৮২ অজুতাংশ জমির ওপর দুটি ফ্ল্যাট। উত্তর মেরাদিয়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৩, আড়াই শতাংশ জমির ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন ৫ তলা ভবন। নন্দীপাড়া (খিলগাঁও): ওয়ার্ড-৭৪, ৩৯ অজুতাংশ জমির ওপর একটি ফ্ল্যাট। কাফরুল: ওয়ার্ড-১৬, ৩৬/২ অংশ জমির ওপর দুটি ফ্ল্যাট। এফডিআর: মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের নিজস্ব নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকার এফডিআর (FDR)। স্বর্ণালঙ্কার: কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৬০ ভরি স্বর্ণ। শেয়ারবাজার ও নগদ টাকা: শেয়ারবাজারে কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি নগদ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ‘ঢাকা মেট্রো-গ ২৮-৩৬৩০’ নম্বরের একটি দামী গাড়ি রয়েছে।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ এই বিশাল সম্পদের খতিয়ান খতিয়ে দেখতে একটি প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সচেতন মহলের দাবি, এই কর্মকর্তার ও তার পরিবারের নামে-বেনামে থাকা সমস্ত অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় বা দুদকীয় অনুসন্ধান প্রয়োজন। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে কাস্টমস প্রশাসনের এই বিতর্কিত কর্মকর্তার দুর্নীতির “থলের বেড়াল” বেরিয়ে আসবে এবং সরকারের রাজস্ব সুরক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা আশা প্রকাশ করেন।

31 October 2026

কাস্টমস আরিফুলে উত্থান ও বিতর্কিত সম্পদ সাম্রাজ্য