১১:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়: দুদকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ০৬:১৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 6

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে অবৈধ উপায়ে গড়া সম্পদের এক বিশাল সাম্রাজ্যের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে নয়টি দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক, জব্দ ও অবরুদ্ধের আওতায় আনা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ পাচার, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে জাবেদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৩টি মামলা করা হয়েছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ ৬১৮ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে আরও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদেশের সম্পদ শনাক্ত ও তা ফেরাতে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর)-সহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে ব্যাংক ঋণ আত্মসাতের নানা অভাবনীয় ও জালিয়াতিপূর্ণ ছক উন্মোচিত হয়েছে। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ছয়টি ঋণের মাধ্যমে ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি মামলা হয়েছে, যেখানে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় কোটি কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে নগদ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এছাড়া কোভিড প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তার কথা বলে নিম্নআয়ের মানুষ—যেমন শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, নাপিত ও দর্জিদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করে তাদের ‘ব্যবসায়ী’ সাজিয়ে আরও ১৯টি মামলার মাধ্যমে ১৩৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আত্মসাৎ করা অর্থ প্রথমে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ঘোরানো হতো, পরে নগদে তুলে হুন্ডির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হতো এবং সেখান থেকে টিটির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে সম্পদ কেনা হতো।

ঘুষ গ্রহণ ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রেও জাবেদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছে দুদক। পাঁচটি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে কিংবা চাপ সৃষ্টি করে মোট ২১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে পাঁচটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি, পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্টের নামে কাঁচামাল সরবরাহকারী ভুয়া মালিক দেখিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এড়িয়ে ইউসিবি ও আইএফআইসি ব্যাংক থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার ঋণ প্রদানের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।

দেশের অভ্যন্তরেও জাবেদের বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান মিলেছে। ঢাকার গুলশানে ২টি এবং চট্টগ্রামে ১০টি ফ্ল্যাট, একটি মার্কেটে ৯টি দোকান, ২৭টি জমি এবং ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য দুদকের তালিকায় এসেছে। ইতিমধ্যেই ঢাকার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রোক করে সেখানে রিসিভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ২৬০ ধরনের মালামালের তালিকা করা হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৯৫৭ বিঘা জমি এবং ২৩টি কোম্পানির ১০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। কালুরঘাট শিল্প এলাকার সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টিই বন্ধ থাকায় সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তিন সদস্যের রিসিভার কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিদেশের মাটিতেও জাবেদের সম্পদের বিস্তার আশঙ্কাজনক। যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে তার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই তার ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য আদালতে পেশ করা হয়েছে। সম্প্রতি তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে সিঙ্গাপুর; সেখানে সাইফুজ্জামান ও রুকমিলার যৌথ হিসাবসহ আটটি ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব, জাসা ওশান পিটিই লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিতে পরিচালকের পদ এবং সেন্ট থমাস ওয়াক এলাকায় ১৬ লাখ ১২ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারে কেনা একটি বাড়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা অবরুদ্ধ করতে আদালতের মঞ্জুরি নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত কিংবা ফ্রিজ করা সহজ হলেও তা বাংলাদেশে ফেরানো বেশ দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে অপরাধের প্রমাণ পেশ করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তবেই সম্পদ পুনরুদ্ধার সম্ভব। অন্যদিকে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তার বাবার সময় থেকেই বিদেশে তাদের পারিবারিক বৈধ ব্যবসা ছিল এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে নেওয়া এসব আইনি পদক্ষেপকে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।

15 September 2026

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়: দুদকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য

abc

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়: দুদকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য

আপডেট এর সময় : ০৬:১৯:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমিলা জামান এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে অবৈধ উপায়ে গড়া সম্পদের এক বিশাল সাম্রাজ্যের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে নয়টি দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে ক্রোক, জব্দ ও অবরুদ্ধের আওতায় আনা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ পাচার, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে জাবেদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৩টি মামলা করা হয়েছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ ৬১৮ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে আরও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিদেশের সম্পদ শনাক্ত ও তা ফেরাতে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর)-সহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে ব্যাংক ঋণ আত্মসাতের নানা অভাবনীয় ও জালিয়াতিপূর্ণ ছক উন্মোচিত হয়েছে। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ছয়টি ঋণের মাধ্যমে ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ছয়টি মামলা হয়েছে, যেখানে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় কোটি কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে নগদ টাকা তুলে নেওয়া হয়। এছাড়া কোভিড প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তার কথা বলে নিম্নআয়ের মানুষ—যেমন শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালক, নাপিত ও দর্জিদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করে তাদের ‘ব্যবসায়ী’ সাজিয়ে আরও ১৯টি মামলার মাধ্যমে ১৩৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব আত্মসাৎ করা অর্থ প্রথমে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ঘোরানো হতো, পরে নগদে তুলে হুন্ডির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হতো এবং সেখান থেকে টিটির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করে সম্পদ কেনা হতো।

ঘুষ গ্রহণ ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনিয়মের ক্ষেত্রেও জাবেদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছে দুদক। পাঁচটি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে কিংবা চাপ সৃষ্টি করে মোট ২১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে পাঁচটি পৃথক মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি, পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্টের নামে কাঁচামাল সরবরাহকারী ভুয়া মালিক দেখিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা গ্রহণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এড়িয়ে ইউসিবি ও আইএফআইসি ব্যাংক থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকার ঋণ প্রদানের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি।

দেশের অভ্যন্তরেও জাবেদের বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান মিলেছে। ঢাকার গুলশানে ২টি এবং চট্টগ্রামে ১০টি ফ্ল্যাট, একটি মার্কেটে ৯টি দোকান, ২৭টি জমি এবং ৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্য দুদকের তালিকায় এসেছে। ইতিমধ্যেই ঢাকার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রোক করে সেখানে রিসিভার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ২৬০ ধরনের মালামালের তালিকা করা হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৯৫৭ বিঘা জমি এবং ২৩টি কোম্পানির ১০২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। কালুরঘাট শিল্প এলাকার সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টিই বন্ধ থাকায় সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তিন সদস্যের রিসিভার কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিদেশের মাটিতেও জাবেদের সম্পদের বিস্তার আশঙ্কাজনক। যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে তার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যেই তার ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য আদালতে পেশ করা হয়েছে। সম্প্রতি তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে সিঙ্গাপুর; সেখানে সাইফুজ্জামান ও রুকমিলার যৌথ হিসাবসহ আটটি ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব, জাসা ওশান পিটিই লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিতে পরিচালকের পদ এবং সেন্ট থমাস ওয়াক এলাকায় ১৬ লাখ ১২ হাজার সিঙ্গাপুর ডলারে কেনা একটি বাড়ীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা অবরুদ্ধ করতে আদালতের মঞ্জুরি নিয়ে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত কিংবা ফ্রিজ করা সহজ হলেও তা বাংলাদেশে ফেরানো বেশ দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতে অপরাধের প্রমাণ পেশ করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তবেই সম্পদ পুনরুদ্ধার সম্ভব। অন্যদিকে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তার বাবার সময় থেকেই বিদেশে তাদের পারিবারিক বৈধ ব্যবসা ছিল এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে এসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে নেওয়া এসব আইনি পদক্ষেপকে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।

15 September 2026

সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়: দুদকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য