০২:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ইলিশ উৎপাদন

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ১১:৫৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 6

সরকারি উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ইলিশ উৎপাদন

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং জিআই পণ্য ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বহুমুখী ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, গবেষণা বৃদ্ধি এবং জেলেদের জন্য ভিজিএফ (VGF) বা বিশেষ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, আগের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে’র মেয়াদ শেষ হলেও ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে নতুন প্রকল্প খুব শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে। নতুন এই প্রকল্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জেলেদের ভিজিএফ সুবিধা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ইকোসিস্টেমের প্রভাবে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমলেও (সর্বশেষ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টনে নেমেছে) সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে আগামীতে উৎপাদন ফের বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব এককভাবে সরকারের নয়; এটি আমাদের সবার। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা (৮ থেকে ২৯ অক্টোবর) যেকোনো মূল্যে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শেরেবাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা উল্লেখ করেন যে, জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস এবং পানি দূষণের কারণে ইলিশের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা জরুরি। তিনি ইলিশের সুরক্ষায় স্যাটেলাইট, জিআইএস, এআই, মেশিন লার্নিং এবং আইওটি সেন্সরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা অঞ্চলের মতো বাংলাদেশের নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদ দেন তিনি।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওহাব জানান, দেশে টেকসই উৎপাদন ধরে রাখতে প্রতিবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ আদর্শ সীমার মধ্যে থাকে। জাটকা নিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় মার্চ-এপ্রিলে জাটকা যখন সাগরের দিকে যায়, তখন নিষিদ্ধ জাল ও ট্রলারের মাধ্যমে নির্বিচারে তা নিধন করা হয়। তাই অভয়াশ্রমগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলেরা বলছেন, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে জাটকা ধরে ফেলার কারণে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। এদিকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, নদীদূষণের কারণে মেঘনা নদীতে ইলিশের প্রধান খাদ্য প্ল্যাংকটন ৬৮ শতাংশ কমে গেছে, যা ইলিশের আকৃতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।

উল্লেখ্য, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (FAO) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং ইলিশ আহরণে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

13 October 2026

সরকারি উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ইলিশ উৎপাদন

আমাদের ফেইসবুক পেইজ

abc

সরকারি উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ইলিশ উৎপাদন

আপডেট এর সময় : ১১:৫৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং জিআই পণ্য ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বহুমুখী ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, গবেষণা বৃদ্ধি এবং জেলেদের জন্য ভিজিএফ (VGF) বা বিশেষ বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, আগের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে’র মেয়াদ শেষ হলেও ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে নতুন প্রকল্প খুব শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে। নতুন এই প্রকল্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জেলেদের ভিজিএফ সুবিধা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ইকোসিস্টেমের প্রভাবে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমলেও (সর্বশেষ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টনে নেমেছে) সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে আগামীতে উৎপাদন ফের বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব এককভাবে সরকারের নয়; এটি আমাদের সবার। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা (৮ থেকে ২৯ অক্টোবর) যেকোনো মূল্যে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

শেরেবাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা উল্লেখ করেন যে, জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস এবং পানি দূষণের কারণে ইলিশের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা জরুরি। তিনি ইলিশের সুরক্ষায় স্যাটেলাইট, জিআইএস, এআই, মেশিন লার্নিং এবং আইওটি সেন্সরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা অঞ্চলের মতো বাংলাদেশের নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণের তাগিদ দেন তিনি।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওহাব জানান, দেশে টেকসই উৎপাদন ধরে রাখতে প্রতিবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ আদর্শ সীমার মধ্যে থাকে। জাটকা নিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় মার্চ-এপ্রিলে জাটকা যখন সাগরের দিকে যায়, তখন নিষিদ্ধ জাল ও ট্রলারের মাধ্যমে নির্বিচারে তা নিধন করা হয়। তাই অভয়াশ্রমগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলেরা বলছেন, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে জাটকা ধরে ফেলার কারণে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। এদিকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, নদীদূষণের কারণে মেঘনা নদীতে ইলিশের প্রধান খাদ্য প্ল্যাংকটন ৬৮ শতাংশ কমে গেছে, যা ইলিশের আকৃতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।

উল্লেখ্য, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (FAO) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বিশ্বে দ্বিতীয় এবং ইলিশ আহরণে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

13 October 2026

সরকারি উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে ইলিশ উৎপাদন