১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শূন্য থেকে কোটিপতি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ

Jaffrey Alam
  • আপডেট এর সময় : ০৭:০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ মে ২০২৫
  • / 311

* পদন্নতি পেতে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ * চুক্তিপত্রে সচিবের সাক্ষর নিয়ে নানান প্রশ্ন
* আপন ভাই বিক্রি করেন খুদ (চালের ভাঙ্গা অংশ), নিজে চড়ের দামি গাড়িতে

জাকির পাটোয়ারী : আগ্রাসী যমুনার ভাঙ্গন কেড়ে নেয়ে ভিটেমাটি। পরিবারের সঙ্গে তখন সিরাজগঞ্জের শেরপুরে নতুন ঠিকানায় শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। অভাবের সংসারে যেখানে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু‘বেলা খাবার তুলে দেয়ায় দায় ছিলো, সেখানে পড়ালেখা- অনেকটা ছেড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন।
এমনই হতদরিদ্র পরিবার থেকে আজ পদ্মকোমল জীবন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের। অভাবের তাড়নায় জরজড়িত জীবনের গল্প মুছে ফেলে আজ তিনি শত কোটি টাকার মালিক। গাড়ি-বাড়ি, জমিজমা, ব্যাংকে সঞ্চয়, ব্যবসায় বিনিয়োগ, কি নেই তার! তার আভিজাত্যের ঝলকানিতে ঈশ্বার্ণীত হবেন যে কেউ।
ঈশ্বর্ণীয় এই সাফল্যের পেছনের গল্প খুঁজেতে গিয়ে মানি লাইনের অনুসন্ধানী দল পেয়ে যায় চাঞ্চলকর সব তথ্য। তবে সেই গল্প তুলে ধরার আগে একবার শোনাতে চায় সিরাজগঞ্জের অজোপাড়া গাঁয়ের ছেলে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের ফেলে আসা দিনগুলি।
শেরপুরে একটি জরাজির্ণ বাড়ি। সেখানেই বসবাস খুদ (চালের ভাঙ্গা অংশ) ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের। চেহারায় অভাব-অনটন আর দারিদ্রের কাড়াঘাতের ছবি স্পষ্ট। তিনি এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের আপন ভাই। ভাই যেখানে সমাজের বিত্তবানদের তালিকায়, সেখানে আপনার এমন অবস্থা কেন, জানতে চাইলে অনেকটা আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমরা চার ভাই। আমার বাবা খুব কষ্ট করে আমাদেরকে মানুষ করেছেন। আমি খুদের ব্যবসা করি, আরেক ভাই বিদেশে থাকেন। একজন গ্রামে চাকরি করেন। আর আব্দুর রশিদ বড় ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর থাকেন। চীফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরে একবার না দুইবার বাড়িতে এসেছেন। তিনি অন্যান্য ভাইদের খুব একটা খোঁজ খবর নেন না বলেও জানান আব্দুর রহমান।
কলেজ রোডে গাড়ির টায়ার পরিবর্তন ও লিকের কাজ করেন আব্দুর রশিদের এক চাচাতো ভাই। এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে তিনি আজ এই পর্যায়ে এসেছেন। তার টাকা পয়সা আছে, তবে তাতে আমাদের কি? ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ কম হয়, মাঝে মাঝে দেখা হয়। দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে আত্মীয়-স্বজনের সাথেও আব্দুর রশিদের যোগাযোগ কমে গেছে বলে জানান তিনি।
কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কালু মিয়ার সাথে। আব্দুর রশিদের কষ্ট করে বেড়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জানান, পাটাগ্রামের জমির উদ্দিন মিয়ার ছেলে আব্দুর রশিদের টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলাকার মানুষ সহযোগিতা করে তাকেসহ বাকি ভাইদের পড়ালেখা করায়। তিনি আরো বলেন, এই গ্রামের ছেলে হয়ে গ্রামে আর আসেন না রশিদ। পাটাগ্রামের পাশে শ্বশুর বাড়িতে মাঝে মাঝে আসেন।
হতদরিদ্র পরিবার থেকে অন্যের সহায়তায় উঠে আসা আব্দুর রশিদের জীবনের গল্প যে কাউকে আবেগ আপ্লুত করে তুলবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে শুন্য থেকে শত কোটি টাকার মালিক কিভাবে হলেন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী!
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর পরিবর্তন আসে অধিকাংশ দপ্তরের কর্তা পর্যায়ে। সেই অনুযায়ী এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর পদেও পরিবর্তন আসে। তবে সুকৌশলে আব্দুর রশিদ প্রটোকল ভেঙ্গে এই পদ বাগিয়ে নেন।
ক্রমানুসারে ওপরের কয়েকজনকে টপকে এই পদ হাসিলে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে। কুমিল্লার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়ীক প্রয়োজন দেখিয়ে ১০০ (একশত) কোটি টাকা ঋণ চুক্তির এমনকি একটি খসড়া হাতে পাওয়ার পর সেই সন্দেহ আরও দানা বাঁধে। যে চুক্তির খসড়ায় প্রথম সাক্ষীর স্থানে একনজন সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তির নাম-ঠিকানা দেয়া রয়েছে। এমনকি খসড়ার প্রতিটি পাতা এবং এর সঙ্গে দেয়া জাতীয় পরিচয় পত্রে ওই ব্যক্তির সাক্ষর রয়েছে।
ওই চুক্তিপত্র ভুয়া হলে সেখানে একজন সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তির সাক্ষর ও সিল কেন? তাছাড়া কোন স্বার্থে এতো টাকা লেনদেনের সাক্ষী হতে গেলেন তিনি। তাও আবার আব্দুর রশিদের পদন্নতির যে দপ্তর থেকে, সেখানেই রয়েছেন তিনি। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে তবে কি নিজেই সাক্ষী হয়ে ঘুষের টাকার লেনদেন করিয়েছেন ওই সচিব?
এমন বেশকিছু প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে মানি লাইনের অনুসন্ধানী দলের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। বিস্তারিত আসছে পরের সংখ্যায়।

31 October 2026

শূন্য থেকে কোটিপতি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ

ট্যাগ :

আমাদের ফেইসবুক পেইজ

abc

শূন্য থেকে কোটিপতি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ

আপডেট এর সময় : ০৭:০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ মে ২০২৫

* পদন্নতি পেতে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ * চুক্তিপত্রে সচিবের সাক্ষর নিয়ে নানান প্রশ্ন
* আপন ভাই বিক্রি করেন খুদ (চালের ভাঙ্গা অংশ), নিজে চড়ের দামি গাড়িতে

জাকির পাটোয়ারী : আগ্রাসী যমুনার ভাঙ্গন কেড়ে নেয়ে ভিটেমাটি। পরিবারের সঙ্গে তখন সিরাজগঞ্জের শেরপুরে নতুন ঠিকানায় শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। অভাবের সংসারে যেখানে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু‘বেলা খাবার তুলে দেয়ায় দায় ছিলো, সেখানে পড়ালেখা- অনেকটা ছেড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন।
এমনই হতদরিদ্র পরিবার থেকে আজ পদ্মকোমল জীবন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের। অভাবের তাড়নায় জরজড়িত জীবনের গল্প মুছে ফেলে আজ তিনি শত কোটি টাকার মালিক। গাড়ি-বাড়ি, জমিজমা, ব্যাংকে সঞ্চয়, ব্যবসায় বিনিয়োগ, কি নেই তার! তার আভিজাত্যের ঝলকানিতে ঈশ্বার্ণীত হবেন যে কেউ।
ঈশ্বর্ণীয় এই সাফল্যের পেছনের গল্প খুঁজেতে গিয়ে মানি লাইনের অনুসন্ধানী দল পেয়ে যায় চাঞ্চলকর সব তথ্য। তবে সেই গল্প তুলে ধরার আগে একবার শোনাতে চায় সিরাজগঞ্জের অজোপাড়া গাঁয়ের ছেলে এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের ফেলে আসা দিনগুলি।
শেরপুরে একটি জরাজির্ণ বাড়ি। সেখানেই বসবাস খুদ (চালের ভাঙ্গা অংশ) ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের। চেহারায় অভাব-অনটন আর দারিদ্রের কাড়াঘাতের ছবি স্পষ্ট। তিনি এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদের আপন ভাই। ভাই যেখানে সমাজের বিত্তবানদের তালিকায়, সেখানে আপনার এমন অবস্থা কেন, জানতে চাইলে অনেকটা আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমরা চার ভাই। আমার বাবা খুব কষ্ট করে আমাদেরকে মানুষ করেছেন। আমি খুদের ব্যবসা করি, আরেক ভাই বিদেশে থাকেন। একজন গ্রামে চাকরি করেন। আর আব্দুর রশিদ বড় ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর থাকেন। চীফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরে একবার না দুইবার বাড়িতে এসেছেন। তিনি অন্যান্য ভাইদের খুব একটা খোঁজ খবর নেন না বলেও জানান আব্দুর রহমান।
কলেজ রোডে গাড়ির টায়ার পরিবর্তন ও লিকের কাজ করেন আব্দুর রশিদের এক চাচাতো ভাই। এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক কষ্ট করে তিনি আজ এই পর্যায়ে এসেছেন। তার টাকা পয়সা আছে, তবে তাতে আমাদের কি? ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ কম হয়, মাঝে মাঝে দেখা হয়। দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে আত্মীয়-স্বজনের সাথেও আব্দুর রশিদের যোগাযোগ কমে গেছে বলে জানান তিনি।
কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কালু মিয়ার সাথে। আব্দুর রশিদের কষ্ট করে বেড়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জানান, পাটাগ্রামের জমির উদ্দিন মিয়ার ছেলে আব্দুর রশিদের টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলাকার মানুষ সহযোগিতা করে তাকেসহ বাকি ভাইদের পড়ালেখা করায়। তিনি আরো বলেন, এই গ্রামের ছেলে হয়ে গ্রামে আর আসেন না রশিদ। পাটাগ্রামের পাশে শ্বশুর বাড়িতে মাঝে মাঝে আসেন।
হতদরিদ্র পরিবার থেকে অন্যের সহায়তায় উঠে আসা আব্দুর রশিদের জীবনের গল্প যে কাউকে আবেগ আপ্লুত করে তুলবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে শুন্য থেকে শত কোটি টাকার মালিক কিভাবে হলেন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী!
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর পরিবর্তন আসে অধিকাংশ দপ্তরের কর্তা পর্যায়ে। সেই অনুযায়ী এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর পদেও পরিবর্তন আসে। তবে সুকৌশলে আব্দুর রশিদ প্রটোকল ভেঙ্গে এই পদ বাগিয়ে নেন।
ক্রমানুসারে ওপরের কয়েকজনকে টপকে এই পদ হাসিলে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে। কুমিল্লার এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ব্যবসায়ীক প্রয়োজন দেখিয়ে ১০০ (একশত) কোটি টাকা ঋণ চুক্তির এমনকি একটি খসড়া হাতে পাওয়ার পর সেই সন্দেহ আরও দানা বাঁধে। যে চুক্তির খসড়ায় প্রথম সাক্ষীর স্থানে একনজন সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তির নাম-ঠিকানা দেয়া রয়েছে। এমনকি খসড়ার প্রতিটি পাতা এবং এর সঙ্গে দেয়া জাতীয় পরিচয় পত্রে ওই ব্যক্তির সাক্ষর রয়েছে।
ওই চুক্তিপত্র ভুয়া হলে সেখানে একজন সচিব পদমর্যাদার ব্যক্তির সাক্ষর ও সিল কেন? তাছাড়া কোন স্বার্থে এতো টাকা লেনদেনের সাক্ষী হতে গেলেন তিনি। তাও আবার আব্দুর রশিদের পদন্নতির যে দপ্তর থেকে, সেখানেই রয়েছেন তিনি। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে তবে কি নিজেই সাক্ষী হয়ে ঘুষের টাকার লেনদেন করিয়েছেন ওই সচিব?
এমন বেশকিছু প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে মানি লাইনের অনুসন্ধানী দলের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। বিস্তারিত আসছে পরের সংখ্যায়।

31 October 2026

শূন্য থেকে কোটিপতি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ