মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ধস: লাইফ ফান্ড ভেঙে ও আয় কমে সংকটে প্রতিষ্ঠানটি
- আপডেট এর সময় : ১২:০৪:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 9
দেশের জীবন বিমা খাতে সার্বিক সংকট, ধারাবাহিক অনিয়ম এবং গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা পুরো খাতকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ওপর। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড (জীবন তহবিল)—দুই সূচকেই বড় ধরনের সংকোচনের চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছরের ব্যবধানে মেঘনা লাইফের ব্যবসা কমেছে ১০৬ কোটি টাকা এবং একই সময়ে লাইফ ফান্ড সংকুচিত হয়েছে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা।
কোম্পানিটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সাল শেষে নেমে দাঁড়ায় ২৮২ কোটি টাকায়। ফলে চার বছরের ব্যবধানে কোম্পানির ব্যবসা কমেছে প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানের লাইফ ফান্ড ছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ধারাবাহিক পতন শেষে ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ লাইফ ফান্ড সংকুচিত হয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ধারাবাহিক এই পতন ইঙ্গিত দেয় যে, নিয়মিত তহবিল ভেঙেই বর্তমানে মেঘনা লাইফের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ব্যবসায়িক এই মন্দার পেছনে প্রধান কারণ নতুন পলিসি সংগ্রহে দুর্বলতা। প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ২০২৩ সালের ৭৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় এসে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, তারল্য সংকট ও গ্রাহকদের আচরণগত পরিবর্তনকে এ জন্য দায়ী করা হলেও বিপরীতে বেড়েছে পুরোনো বিমা দাবির চাপ। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কোম্পানির দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪২০ কোটি ৭৭ লাখ এবং ৪৪৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা সংশ্লিষ্ট বছরের মোট প্রিমিয়াম আয়ের চেয়েও বেশি ছিল। ২০২৫ সালেও যেখানে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ২৮২ কোটি টাকা, সেখানে দাবির পরিমাণ ছিল ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
আয়ের অন্য একটি বড় উৎস বিনিয়োগেও দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা দেখা গেছে। ২০২০ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ আয় ছিল ৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালে কমে ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নামে এবং ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও এর দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করা হয়। তবে এই সময়ে মেঘনা লাইফ তাদের ব্যবস্থাপনা ও কমিশন ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালের ১০৭ কোটি ১২ লাখ টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৬৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়। তবুও লাইফ ফান্ড ও ব্যবসার সংকোচন ঠেকাতে এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা ও জীবন তহবিল কমতে থাকা বিমা কোম্পানির গ্রাহকস্বার্থের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করে। নতুন ব্যবসা বৃদ্ধি, লাইফ ফান্ড শক্তিশালী করা এবং গ্রাহকের আস্থা ফেরাটাই এখন প্রতিষ্ঠানটির বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকটের বিষয়ে কথা বলতে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মোহাম্মদ তারেক এফসিএ-এর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানান, আইডিআরএ বিমা দাবি পরিশোধকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার কাজ চলছে, যা সম্পন্ন হলে প্রিমিয়াম ও লাইফ ফান্ডের সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলো নিয়ে সহজেই পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।



















