০৫:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিঁদুরের রঙে বিদায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্য! বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গোৎসবে এবার ম্লান জনসমাগম

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ০৪:০৪:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 15

সিঁদুরের রঙে বিদায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্য! বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গোৎসবে এবার ম্লান জনসমাগম

ঢাকের বাদ্য, নাচ আর সিঁদুর খেলার আবেগঘন মুহূর্তে শেষ হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারঘরিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বাইশ পুতুল’খ্যাত দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিদায়ের ক্ষণ নেমে আসে পূজামণ্ডপে। রাতে মহানন্দা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা এই প্রাচীন দুর্গোৎসবের। আয়োজক কমিটির দাবি, এবার এ পূজার ৩২১তম বার্ষিকী।

দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন দুর্গাপূজা হিসেবে পরিচিত বারঘরিয়ার এই আয়োজন। শুধু জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেই নয়, দূরদূরান্ত থেকেও শত শত পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী ছুটে আসেন ‘বাইশ পুতুল’-এর প্রতিমা দেখতে। পূজাকে ঘিরে মন্দিরসংলগ্ন সড়কের পাশে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রতিমা দর্শন আর মেলায় ঘোরাঘুরি—দুইয়ে মিলে বহু মানুষের দুর্গোৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায়। তবে দীর্ঘদিনের সেই আকর্ষণ থাকলেও এবার পূজামণ্ডপ ও মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজক ও ব্যবসায়ীরা।

বাইশ প্রতিমায় অনন্য ঐতিহ্য
বারঘরিয়ার এই দুর্গাপূজার বিশেষত্ব এর প্রতিমা বিন্যাসে। প্রচলিত পূজার আয়োজনের তুলনায় এখানে একসঙ্গে ২২টি প্রতিমা স্থান পেয়েছে। আর এ কারণেই পূজাটি ‘বাইশ পুতুলের দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা বিন্যাসে সবার ওপরে রয়েছেন গঙ্গাদেবী। এর নিচে গাড়ির ওপর গলায় সাপ জড়ানো মহাদেব, তাঁর দুই পাশে নন্দী ও ভৃঙ্গী হিসেবে পরিচিত অনুচর, রাম ও লক্ষ্মণের প্রতিমা রয়েছে। এরপর কেন্দ্রে বিরাজ করছেন দেবী দুর্গা। পাশাপাশি রয়েছেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। তাঁদের বাহন হিসেবে রয়েছে ইঁদুর, ময়ূর, প্যাঁচা ও সাদা হাঁস। সব মিলিয়ে ২২টি প্রতিমার সমাহার এই পূজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

জনশ্রুতিতে পূজার সূচনার ইতিহাস
ঠিক কবে, কার উদ্যোগে কিংবা কীভাবে বারঘরিয়ায় এই পূজার সূচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি ও প্রচলিত ইতিহাসে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর কাহিনি।

১৯৮৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রণব কুমার পালের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা ইউনিয়নের শুক্রবাড়ি গ্রামে ‘বাইশ পুতুলের’ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। কোনো এক সমস্যার কারণে সেখানকার পূজা উদ্‌যাপনকারীরা পূজার কাঠামো বা পাঠ মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেন। নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে সেটি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এসে ঠেকে বর্তমান বারঘরিয়া এলাকায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, শুক্রবাড়ির পূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি স্বপ্নে নির্দেশনা পান—যেখানে পূজার কাঠামো এসে ঠেকেছে, সেখানেই এই পূজার আয়োজন করতে হবে। পরে শুক্রবাড়ির লোকজন বারঘরিয়ায় এসে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পূজাটি আয়োজনের অনুরোধ জানান। মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও কিনে দেন তাঁরা। সেই থেকে বারঘরিয়ায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এই প্রাচীন দুর্গাপূজা।

যদিও এসব ঘটনার স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, স্থানীয়দের কাছে কাহিনিটি পূজার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহ্যের জৌলুসে ভাটা, কমেছে দর্শনার্থী
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আর ব্যাপক পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও এবারের আয়োজনে আগের মতো জনসমাগম দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার পর্যন্ত পূজামণ্ডপ ও মেলা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত মণ্ডপ এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় তুলনামূলক কম ছিল।

পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মৃণাল কান্তি পাল বলেন, নবমীর দিনে আমাদের মণ্ডপে সাধারণত উপচে পড়া ভিড় থাকে। মানুষের আসা-যাওয়ার সময় অনেক কষ্ট করতে হয়। কিন্তু এবার সেই তুলনায় লোকসমাগম কম ছিল।

তিনি আরও বলেন, মন্দিরের আয় খুবই কম, অথচ ব্যয় অনেক বেশি। ফলে পূজার খরচ মেটাতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এবার পূজার দানবাক্সেও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম দান জমা পড়েছে।
নিরাপত্তার বিষয়টিও এবারের আয়োজনে বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। কয়েক দিন ধরে প্রতি রাতে পাহারার দায়িত্বে এলাকার প্রায় ১০০ জনকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয়েছে। এতে পূজার ব্যয় আরও বেড়েছে।

মৃণাল কান্তি পাল জানান, সম্প্রতি বাইশপুতুল সার্বজনীন দুর্গামন্দির পরিদর্শন করেছেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি তাপসী দত্ত। তিনি মন্দিরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

মেলাতেও বেচাকেনা কম, হতাশ ব্যবসায়ীরা
বারঘরিয়ার দুর্গাপূজাকে ঘিরে বসা মেলাটি স্থানীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত আকর্ষণ। মেলায় নানা ধরনের মিষ্টি, খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দর্শনার্থী কম থাকায় এবার তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারেননি।
মেলায় মিষ্টির দোকান নিয়ে বসা ব্যবসায়ী জাইদুল হক বলেন, এবার মেলায় মানুষের সমাগম কম। গত বছরের তুলনায় তাঁর মিষ্টি বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

হারিয়ে যাচ্ছে মেলার পুরোনো জৌলুস
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক একাধিক বইয়ের লেখক এবং নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, বারঘরিয়ার বাইশ পুতুলের দুর্গাপূজা জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন ধর্মীয় আয়োজন। একসময় জেলা ও জেলার বাইরের হাজারো মানুষ এই পূজা দেখতে আসতেন। পূজাকে কেন্দ্র করে বসত বিশাল মেলা। আশপাশে ছিল বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। আয়োজন করা হতো যাত্রাপালা ও নাটক।

তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বহু বছর ধরে যাত্রাপালা ও নাটকের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। মেলার বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গাগুলোতে বাড়িঘর গড়ে ওঠায় মেলার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে আগের মতো জৌলুস আর চোখে পড়ে না। এবারও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার প্রত্যাশা
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস, লোককথা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই আয়োজন ঘিরে মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে আবেগ ও আত্মিক বন্ধন।

তবে সময়ের পরিবর্তনে মেলার পরিসর সংকুচিত হওয়া, দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং পূজার ব্যয় নির্বাহে আয়োজকদের সংকট ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন সামনে এনেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় বারঘরিয়ার এই প্রাচীন আয়োজন তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে এবং আগামী প্রজন্মের কাছেও সমান গুরুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকবে।

সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটলেও বারঘরিয়ার মানুষের মনে রয়ে গেল বহু পুরোনো এই দুর্গোৎসবের স্মৃতি, আবেগ আর ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রত্যাশা।

21 October 2026

সিঁদুরের রঙে বিদায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্য! বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গোৎসবে এবার ম্লান জনসমাগম

আমাদের ফেইসবুক পেইজ

abc

সিঁদুরের রঙে বিদায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্য! বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গোৎসবে এবার ম্লান জনসমাগম

আপডেট এর সময় : ০৪:০৪:৩০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকের বাদ্য, নাচ আর সিঁদুর খেলার আবেগঘন মুহূর্তে শেষ হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বারঘরিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বাইশ পুতুল’খ্যাত দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিদায়ের ক্ষণ নেমে আসে পূজামণ্ডপে। রাতে মহানন্দা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা এই প্রাচীন দুর্গোৎসবের। আয়োজক কমিটির দাবি, এবার এ পূজার ৩২১তম বার্ষিকী।

দীর্ঘদিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন দুর্গাপূজা হিসেবে পরিচিত বারঘরিয়ার এই আয়োজন। শুধু জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেই নয়, দূরদূরান্ত থেকেও শত শত পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী ছুটে আসেন ‘বাইশ পুতুল’-এর প্রতিমা দেখতে। পূজাকে ঘিরে মন্দিরসংলগ্ন সড়কের পাশে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রতিমা দর্শন আর মেলায় ঘোরাঘুরি—দুইয়ে মিলে বহু মানুষের দুর্গোৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায়। তবে দীর্ঘদিনের সেই আকর্ষণ থাকলেও এবার পূজামণ্ডপ ও মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজক ও ব্যবসায়ীরা।

বাইশ প্রতিমায় অনন্য ঐতিহ্য
বারঘরিয়ার এই দুর্গাপূজার বিশেষত্ব এর প্রতিমা বিন্যাসে। প্রচলিত পূজার আয়োজনের তুলনায় এখানে একসঙ্গে ২২টি প্রতিমা স্থান পেয়েছে। আর এ কারণেই পূজাটি ‘বাইশ পুতুলের দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা বিন্যাসে সবার ওপরে রয়েছেন গঙ্গাদেবী। এর নিচে গাড়ির ওপর গলায় সাপ জড়ানো মহাদেব, তাঁর দুই পাশে নন্দী ও ভৃঙ্গী হিসেবে পরিচিত অনুচর, রাম ও লক্ষ্মণের প্রতিমা রয়েছে। এরপর কেন্দ্রে বিরাজ করছেন দেবী দুর্গা। পাশাপাশি রয়েছেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। তাঁদের বাহন হিসেবে রয়েছে ইঁদুর, ময়ূর, প্যাঁচা ও সাদা হাঁস। সব মিলিয়ে ২২টি প্রতিমার সমাহার এই পূজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

জনশ্রুতিতে পূজার সূচনার ইতিহাস
ঠিক কবে, কার উদ্যোগে কিংবা কীভাবে বারঘরিয়ায় এই পূজার সূচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি ও প্রচলিত ইতিহাসে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর কাহিনি।

১৯৮৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রণব কুমার পালের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা ইউনিয়নের শুক্রবাড়ি গ্রামে ‘বাইশ পুতুলের’ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। কোনো এক সমস্যার কারণে সেখানকার পূজা উদ্‌যাপনকারীরা পূজার কাঠামো বা পাঠ মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেন। নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে সেটি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এসে ঠেকে বর্তমান বারঘরিয়া এলাকায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, শুক্রবাড়ির পূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি স্বপ্নে নির্দেশনা পান—যেখানে পূজার কাঠামো এসে ঠেকেছে, সেখানেই এই পূজার আয়োজন করতে হবে। পরে শুক্রবাড়ির লোকজন বারঘরিয়ায় এসে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পূজাটি আয়োজনের অনুরোধ জানান। মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও কিনে দেন তাঁরা। সেই থেকে বারঘরিয়ায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এই প্রাচীন দুর্গাপূজা।

যদিও এসব ঘটনার স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, স্থানীয়দের কাছে কাহিনিটি পূজার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐতিহ্যের জৌলুসে ভাটা, কমেছে দর্শনার্থী
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আর ব্যাপক পরিচিতি থাকা সত্ত্বেও এবারের আয়োজনে আগের মতো জনসমাগম দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার পর্যন্ত পূজামণ্ডপ ও মেলা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত মণ্ডপ এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় তুলনামূলক কম ছিল।

পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মৃণাল কান্তি পাল বলেন, নবমীর দিনে আমাদের মণ্ডপে সাধারণত উপচে পড়া ভিড় থাকে। মানুষের আসা-যাওয়ার সময় অনেক কষ্ট করতে হয়। কিন্তু এবার সেই তুলনায় লোকসমাগম কম ছিল।

তিনি আরও বলেন, মন্দিরের আয় খুবই কম, অথচ ব্যয় অনেক বেশি। ফলে পূজার খরচ মেটাতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এবার পূজার দানবাক্সেও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম দান জমা পড়েছে।
নিরাপত্তার বিষয়টিও এবারের আয়োজনে বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। কয়েক দিন ধরে প্রতি রাতে পাহারার দায়িত্বে এলাকার প্রায় ১০০ জনকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের খাবারের ব্যবস্থাও করতে হয়েছে। এতে পূজার ব্যয় আরও বেড়েছে।

মৃণাল কান্তি পাল জানান, সম্প্রতি বাইশপুতুল সার্বজনীন দুর্গামন্দির পরিদর্শন করেছেন হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি তাপসী দত্ত। তিনি মন্দিরের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

মেলাতেও বেচাকেনা কম, হতাশ ব্যবসায়ীরা
বারঘরিয়ার দুর্গাপূজাকে ঘিরে বসা মেলাটি স্থানীয় মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত আকর্ষণ। মেলায় নানা ধরনের মিষ্টি, খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দর্শনার্থী কম থাকায় এবার তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারেননি।
মেলায় মিষ্টির দোকান নিয়ে বসা ব্যবসায়ী জাইদুল হক বলেন, এবার মেলায় মানুষের সমাগম কম। গত বছরের তুলনায় তাঁর মিষ্টি বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

হারিয়ে যাচ্ছে মেলার পুরোনো জৌলুস
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক একাধিক বইয়ের লেখক এবং নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, বারঘরিয়ার বাইশ পুতুলের দুর্গাপূজা জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন ধর্মীয় আয়োজন। একসময় জেলা ও জেলার বাইরের হাজারো মানুষ এই পূজা দেখতে আসতেন। পূজাকে কেন্দ্র করে বসত বিশাল মেলা। আশপাশে ছিল বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা। আয়োজন করা হতো যাত্রাপালা ও নাটক।

তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বহু বছর ধরে যাত্রাপালা ও নাটকের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। মেলার বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গাগুলোতে বাড়িঘর গড়ে ওঠায় মেলার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে আগের মতো জৌলুস আর চোখে পড়ে না। এবারও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার প্রত্যাশা
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস, লোককথা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই আয়োজন ঘিরে মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে আবেগ ও আত্মিক বন্ধন।

তবে সময়ের পরিবর্তনে মেলার পরিসর সংকুচিত হওয়া, দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং পূজার ব্যয় নির্বাহে আয়োজকদের সংকট ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন সামনে এনেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় বারঘরিয়ার এই প্রাচীন আয়োজন তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে এবং আগামী প্রজন্মের কাছেও সমান গুরুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকবে।

সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটলেও বারঘরিয়ার মানুষের মনে রয়ে গেল বহু পুরোনো এই দুর্গোৎসবের স্মৃতি, আবেগ আর ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রত্যাশা।

21 October 2026

সিঁদুরের রঙে বিদায় ৩২১ বছরের ঐতিহ্য! বারঘরিয়ার ‘বাইশ পুতুল’ দুর্গোৎসবে এবার ম্লান জনসমাগম