দুর্নীতির বরপুত্র পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নাফিজ সরাফাত; দুদকের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য
- আপডেট এর সময় : ০৬:১২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / 327
(শেখ হাসিনাকে ‘ফুফু’ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে ‘চাচা’ বলে পরিচয় দিতেন নাফিজ) মাত্র ১৩ বছরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যমসহ আরও কিছু খাতে রহস্যজনক উত্থান নাফিজ সরাফাতের। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নাফিজ সরাফাতের সম্পদ অনুসন্ধানে দুদকের হাতে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৯৯৯ সালে চাকরিজীবন শুরু করেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। বিদেশি এ ব্যাংকে থাকার সময় হঠাৎ করেই বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হন তিনি। এক ব্যাংকে চাকরি আর অন্য ব্যাংকে পরিচালক, এমন প্রশ্ন ওঠার পর তিনি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। ২০০৮ সালে তিনি যোগ দেন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে। হন কনজ্যুমার ব্যাংকিংয়ের প্রধান। সাবেক ফারমার্স (বর্তমানে পদ্মা) ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে ২০১৭ সালে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। এরপরই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। এর কদিন পরেই মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নাফিজ সরাফাত একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। বেরিয়ে আসতে থাকে দুজনেরই ভয়াবহ লুটপাট ও দুর্নীতির চিত্র। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন খাতের অন্যতম প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন নাফিজ সরাফাত। শুরুতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন। পরে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে। গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার সুবাদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ফুফু’ বলে সম্বোধন করতেন তিনি। আর সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ছিলেন তাঁর ‘চাচা’। গোপালগঞ্জের মানুষ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ‘কাজিন’ হিসেবেই চিনতেন। শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে নাফিজ সরাফাতের ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। দুদকের অনুসন্ধান বলছে, চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের নামে রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। গুলশান-২–এ রয়েছে ২০ তলাবিশিষ্ট একটি বাড়ি। এর বাইরে পূর্বাচলে সাড়ে সাত কাঠার একটি প্লট রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর ও বাড্ডায় তাঁর ২৫ কাঠার জমি রয়েছে। চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদের নামে রাজধানীতে পাঁচটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সাড়ে সাত কাঠা জমির ওপর চারতলা একটি বাড়িও রয়েছে তাঁর। এর বাইরে তাঁর নামে আরও ১৩ কাঠা জমির সন্ধান পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া চৌধুরী নাফিস ও আঞ্জুমান আরার ছেলে চৌধুরী রাহিব সাফওয়ান সরাফতের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থাকা সাতটি ফ্ল্যাট পাওয়া গেছে। যদিও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করা চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের নামে থাকা ২২টি ফ্ল্যাট, ২টি বাড়িসহ সব প্লট ও জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন এ আদেশ দেন। অনুসন্ধানে যানা যায়, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত। ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান উপদেষ্টা সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। এই দুজনে ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১৭১ দশমিক ১৬ কাঠার একটি প্লট এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ নেন। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল নকশায় প্লটটি ছিল ‘সেকেন্ডারি স্কুল’। শ্রেণি পরিবর্তন করে ‘কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়’ করতে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর নাফিজ সরাফাত আবেদন করলে রাজউকের পর্ষদ সভায় তা উপ¯’াপিত হওয়ার পর ২৬ ডিসেম্বর অনুমোদন দেওয়া হয়।এই প্লটের মূল্য প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। এছাড়া, নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা সাহিদ চৌধুরীর নামের গুলশানের ১০৩ নম্বর সড়কের প্লটটি ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই বাণিজ্যিক প্লট করার আবেদন করলে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের হস্তক্ষেপে রাজউক এতে অনুমোদন দেয়। অথচ প্লটটি ‘বাণিজ্যিক ব্যবহারের আওতাভুক্ত নয়’ বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল রাজউক। নাফিজ পরিবারের কার কী সম্পদ মিউচুয়াল ফান্ডগুলোয় মালিকানার পাশাপাশি নাফিজ সরাফাত আরগাস ক্রেডিট রেটিং সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান। আর কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির পর্ষদে আছে তাঁর ভাই-বোন ও ছেলেমেয়ে। এ ছাড়া পদ্মা ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ারের পরিচালক নাফিজ সরাফাত। পদ্মা ব্যাংকের গোপালগঞ্জ শাখাটি তাঁদের পারিবারিক ভবন। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, গ্রিন রোড, গুলশান, বারিধারা ও নিকুঞ্জে নাফিজ, তাঁর স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে আটটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর বাইরে কানাডায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। কানাডা বাংলাদেশ চেম্বার হাউসের (কানাডা) সভাপতি, কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব ও আর্মি গলফ ক্লাবের সদস্য, ওয়ার্ল্ড চেজ ফেডারেশনের (বাংলাদেশ বিভাগ) সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য তিনি।



















