লুটপাট ও দুর্নীতিতে খাঁদের কিনারায় বস্ত্র অধিদপ্তর
- আপডেট এর সময় : ১২:৫৪:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / 125
দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি পোশাকখাত। আর এই পোশাকখাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সিটিটিউট। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি আর লুটপাটে খাদের কিনারায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ বস্ত্র অধিদপ্তর। টেন্ডার জালিয়াতি, চড়া দামে যন্ত্রপাতি কেনাসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
গত বছরের অক্টোবরে এক ঠিকাদারের আইনজীবীর পাঠানো লিগাল নোটিশে আলোচনায় এসেছে টেক্সটাইল ইন্সিটিটিউটের যন্ত্রপাতি কেনার একটি প্রকল্প। যেখানে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে কাগজপত্র কম দেখিয়ে তার নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেয়া, এক-দুই বাদ দিয়ে তৃতীয় সর্বোনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়াসহ নানান অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকটি ইন্সিটিটিউটে যন্ত্রপাতি কেনারে এই প্রকল্পের শুরুতেই দরপত্র আহ্বান নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। কয়েকটি গ্রুপে দরপত্র আহ্বানের আবেদনও জানান এক ঠিকাদার। বিষয়টি আমলে না নিয়েই একত্রে কয়েকটি ইন্সটিটিউটের দরপত্র একসঙ্গে আহ্বান করা হয়।এখানেই শেষ নয়, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে জুড়ে দেয়া হয় নানান শর্ত। এর মধ্যে ২১ কোটি টাকার কাজে ২৯ কোটি টাকার ক্রেডিট ফেসিলিটি চাওয়ার বিষয়টিও বেশ সমালোচনা সৃষ্টি করে।
সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের টেক্সটাইল মেশিনারিজের দরপত্র প্রতিযোগীতায় চব্বিশ কোটি একাত্তর লাখ পঁচাশি হাজার টাকা সর্বনিম্ন দর প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে ঊনত্রিশ কোটি সাতাত্তর লাখ আশি হাজার টাকায় তৃতীয় দরদাতা ঢাকা ট্রেডিং কর্পোরেশনকে দেয়া হয় কাজ। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবার একটি আবেদনও করেন। কিন্তু কথা আছে যেমন বাঁশ তেনই কঞ্চি। বিষয়টি কাগজে কলমেই রয়ে গেছে। সুরাহা হয়নি এখনও।
ওই ঠিকাদারের দাবি সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গর কবির নানকের আস্থাভাজন এবং আওয়ামী দোসর সুনামগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট প্রকল্প পরিচালক মোঃ সাখাওয়াত হোসেন অনৈতিকভাবে তাকে কাজ না দিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন। বিশেষ সুবিধা নেয়া ও আওয়ামী দোসরদের প্রতিষ্ঠা করতে এই যোগশাজস বলেও দাবি তার। তিনি আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালক দরপত্র আহ্বানে এমন সব সর্ত জুড়ে দেন যে এই প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় এবং সাধারণ ঠিকাদারদের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব না।
এনিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা না বললেও, নানান যুক্তি তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। আওয়ামী দোসরদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে সবকিছু।
এদিকে, গুটি কয়েক কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে স্বীকার করে বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, তদন্ত করে নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কথা সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় আরকেটি চিঠিতে। যেখানে একটি মেশিন কেনার জায়গায় সরবরাহ করা হয়েছে অন্য একটি মেশিন। বেগমগঞ্জ টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের একটি টেন্ডারে ফ্ল্যাট বেড স্ক্রিন প্রিন্টিং মেশিনের পরিবর্তে ডিজিটাল প্রিন্টিং মেশিন সরবরাহ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এক চিঠিতে প্রকল্প পরিচালক বস্ত্র অধিদপ্তরের পরিচালককে বিষয়টি জানান। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যে মেশিনটি সরবরাহ করা হয়েছে সেটি চালু করা যায়নি। এছাড়া এটি ফ্ল্যাট বেড স্ক্রিন প্রিন্টিং মেশিন না। দরপত্র অনুযায়ী ফ্ল্যাট বেড স্ক্রিন প্রিন্টিং মেশিনের মূল্য ধরা হয়েছিলো ৩০ লাখ টাকা। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠঅন মাত্র ৮ লাখ টাকা দামের ডিজিটাল প্রিন্টিং মেশিন সরবরাহ করেন।
শুধু এখানেই নয়, দেশ জুড়েই চলছে এই লুটপাট। সচেতন মহল বলছে, সরকারের নজরদারির অভাবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সিটিটিউটগুলোতে চলে ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতি। মানহীন যন্ত্র সরবরাহ, দরপত্রের সর্ত লঙ্ঘন, এক মেশিনের পরিবর্তে অন্য মেশিন সরবরাহ, নিম্ন মানের স্বল্প মূল্যে মেশিন চড়া দাম দেখিয়ে সরবরাহ করাসহ এই খাতে অনিয়মের শেষ নেই। কিন্তু উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য, নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাব, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে আজ খাঁদের কিনারায় এই খাত।
সরকারি টাকা লটুপাট ঠেকাতে দ্রুত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি সচেতন মহলের।




















