০১:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতারণা ও ভেলকিবাজির রাজা সাবেক এমপি আউয়াল

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ০৭:৩৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / 182

বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার মূল হাতিয়ার হিসেবে অনেকেই প্রতারণা, দখল ও প্রভাব বিস্তারকে ব্যবহার করেন। সেই ধারা মেনেই আলোচনায় আসেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন এম এ আউয়াল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার মাধ্যমে সামনে আসে তার অন্ধকার অতীত। হয়ে ওঠেন এক আতঙ্কের নাম।
ইছাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ নারায়নপুর গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা আউয়াল একসময় ছিলেন অচেনা নাম। কিন্তু ২০১৩ সালে তরিকত ফেডারেশনের মনোনয়ন পেয়ে হঠাৎ আলোচনায় আসেন তিনি। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে হেলিকপ্টারে প্রচারণা চালিয়ে বেশ সমালোচিতও হন।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর থেকেই শুরু হয় তার বিতর্কিত অধ্যায়। ক্ষমতার দাপটে প্রতিটি সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন হাতিয়ে নেয়া, দলীয় বিভক্তি ও ভয়ের রাজত্ব কায়েম, দখল দারিত্ব, প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়া ছিলো তার মধ্যে অন্যতম। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ হলেও ২০১৮ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তরিকত ফেডারেশন থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। পরে জাকের পার্টি থেকে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলে ঋণ খেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হয়।
রাজনীতির পাশাপাশি চতুর এই ব্যাক্তি সাধারণ মানুষকে লুটের নতুন ফায়দা আটেন। শুরু করেন হাভেলি প্রপার্টি নামের প্রতারণার সাম্রাজ্য। ২০০৪ সালে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান মিরপুরের উত্তর কালশীতে ৪০ একর জমি দখল করে ‘আলীনগর আবাসিক প্রকল্প’ নামে নতুন প্রকল্প শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, ক্রেতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিলেও জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেননি তিনি। জাল কাগজপত্র, দখলদারিত্ব ও প্রতারণার অভিযোগে প্রকল্পটি নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু ভুক্তোভোগীরা আউয়ালের ক্ষমতার কাছে হার মানেন। আউয়ালের সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় বিলিয়ে দিয়েও পাননি এক টুকরো জমি।
প্রতারক সেই আউয়ালের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে কোন পদক্ষেপ নেয়া না হলেও, বর্তমান সরকার বেশ গুরুত্ব সহকারেই নেয় বিষয়টি। সেই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় আউয়ালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান।
সম্প্রতি দুদক আউয়াল ও তার পরিবারের সম্পদ অনুসন্ধানে মাঠে নামে। চট্টগ্রাম দুদকের জেলা কার্যালয় থেকে প্রেরিত চিঠিতে আউয়ালের স্ত্রী শারমিন নাহার, সন্তান মাইশা নাওয়ার, আওসাফ মোস্তাকিম ও আলানাহ মোস্তাকিমের নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পদের উৎস তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয় এই পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের হিসাব মিলছে না। জমি, ব্যাংক হিসাব ও নগদ অর্থ কোথা থেকে এসেছে তার সঠিক জবাব তারা দিতে পারেননি। অর্থাৎ প্রতারণা ও দখলদারিত্ব থেকে অর্জিত অর্থ পরিবারের নামে পাচার ও রূপান্তরের চেষ্টা হয়েছে বলেই মনে করছে দুদক।
প্রতারণার মাধ্যমে শুধু দেশে সম্পদের পাহাড় নয়, বিদেশেও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে আউয়াল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে।
এতো দিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ক্ষমতার ছায়তলে থেকে অপকর্ম করে চলা আউয়ালের বিরুদ্ধে কেউ কথা না বললেও, এখন একে একে বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল। মিরপুরে ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করা এই ব্যাক্তির অপকর্ম নিয়ে স্থানীয়রা জানান, ২০১৫ সালে ঢাকায় জমি দখল নিয়ে আউয়ালের ভাড়াটে বাহিনীর হাতে কলেজছাত্র চঞ্চল খুন হন। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ভিন্নমতের নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হন নিয়মিত। অন্তত ৩০টির বেশি হামলা, মামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আউয়ালের নাম জড়িত ছিল। আর ২০২১ সালের ১৬ মে পল্লবীতে সন্তানের সামনে বাবাকে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সবারই জানা। ওই ঘটনায় আউয়াল সরাসরি জড়িত থাকলেও, রাজনৈকিত ক্ষমতার দাপটে সবকিছু ধামাচাপা দিয়েছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের পরও টাকা ও ক্ষমতা দিয়ে বেরিয়ে আসেন জামিনে। এরপর বাদিকে টাকা দিয়ে ম্যানেজে ব্যার্থ হয়ে বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখানোসহ চার্জশিট থেকে নিজের নাম বাদ দেয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এতো কিছুর পরও আউয়াল ও তার বাহিনীকে দমাতে পারেনি তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

28 July 2026

প্রতারণা ও ভেলকিবাজির রাজা সাবেক এমপি আউয়াল

abc

প্রতারণা ও ভেলকিবাজির রাজা সাবেক এমপি আউয়াল

আপডেট এর সময় : ০৭:৩৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার মূল হাতিয়ার হিসেবে অনেকেই প্রতারণা, দখল ও প্রভাব বিস্তারকে ব্যবহার করেন। সেই ধারা মেনেই আলোচনায় আসেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন এম এ আউয়াল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার মাধ্যমে সামনে আসে তার অন্ধকার অতীত। হয়ে ওঠেন এক আতঙ্কের নাম।
ইছাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ নারায়নপুর গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা আউয়াল একসময় ছিলেন অচেনা নাম। কিন্তু ২০১৩ সালে তরিকত ফেডারেশনের মনোনয়ন পেয়ে হঠাৎ আলোচনায় আসেন তিনি। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে হেলিকপ্টারে প্রচারণা চালিয়ে বেশ সমালোচিতও হন।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর থেকেই শুরু হয় তার বিতর্কিত অধ্যায়। ক্ষমতার দাপটে প্রতিটি সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন হাতিয়ে নেয়া, দলীয় বিভক্তি ও ভয়ের রাজত্ব কায়েম, দখল দারিত্ব, প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়া ছিলো তার মধ্যে অন্যতম। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ হলেও ২০১৮ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তরিকত ফেডারেশন থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। পরে জাকের পার্টি থেকে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করলে ঋণ খেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হয়।
রাজনীতির পাশাপাশি চতুর এই ব্যাক্তি সাধারণ মানুষকে লুটের নতুন ফায়দা আটেন। শুরু করেন হাভেলি প্রপার্টি নামের প্রতারণার সাম্রাজ্য। ২০০৪ সালে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান মিরপুরের উত্তর কালশীতে ৪০ একর জমি দখল করে ‘আলীনগর আবাসিক প্রকল্প’ নামে নতুন প্রকল্প শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, ক্রেতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিলেও জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেননি তিনি। জাল কাগজপত্র, দখলদারিত্ব ও প্রতারণার অভিযোগে প্রকল্পটি নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু ভুক্তোভোগীরা আউয়ালের ক্ষমতার কাছে হার মানেন। আউয়ালের সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় বিলিয়ে দিয়েও পাননি এক টুকরো জমি।
প্রতারক সেই আউয়ালের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে কোন পদক্ষেপ নেয়া না হলেও, বর্তমান সরকার বেশ গুরুত্ব সহকারেই নেয় বিষয়টি। সেই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় আউয়ালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান।
সম্প্রতি দুদক আউয়াল ও তার পরিবারের সম্পদ অনুসন্ধানে মাঠে নামে। চট্টগ্রাম দুদকের জেলা কার্যালয় থেকে প্রেরিত চিঠিতে আউয়ালের স্ত্রী শারমিন নাহার, সন্তান মাইশা নাওয়ার, আওসাফ মোস্তাকিম ও আলানাহ মোস্তাকিমের নাম উল্লেখ করে তাদের সম্পদের উৎস তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে বলা হয় এই পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের হিসাব মিলছে না। জমি, ব্যাংক হিসাব ও নগদ অর্থ কোথা থেকে এসেছে তার সঠিক জবাব তারা দিতে পারেননি। অর্থাৎ প্রতারণা ও দখলদারিত্ব থেকে অর্জিত অর্থ পরিবারের নামে পাচার ও রূপান্তরের চেষ্টা হয়েছে বলেই মনে করছে দুদক।
প্রতারণার মাধ্যমে শুধু দেশে সম্পদের পাহাড় নয়, বিদেশেও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে আউয়াল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে।
এতো দিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ক্ষমতার ছায়তলে থেকে অপকর্ম করে চলা আউয়ালের বিরুদ্ধে কেউ কথা না বললেও, এখন একে একে বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল। মিরপুরে ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করা এই ব্যাক্তির অপকর্ম নিয়ে স্থানীয়রা জানান, ২০১৫ সালে ঢাকায় জমি দখল নিয়ে আউয়ালের ভাড়াটে বাহিনীর হাতে কলেজছাত্র চঞ্চল খুন হন। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ভিন্নমতের নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হন নিয়মিত। অন্তত ৩০টির বেশি হামলা, মামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় আউয়ালের নাম জড়িত ছিল। আর ২০২১ সালের ১৬ মে পল্লবীতে সন্তানের সামনে বাবাকে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সবারই জানা। ওই ঘটনায় আউয়াল সরাসরি জড়িত থাকলেও, রাজনৈকিত ক্ষমতার দাপটে সবকিছু ধামাচাপা দিয়েছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের পরও টাকা ও ক্ষমতা দিয়ে বেরিয়ে আসেন জামিনে। এরপর বাদিকে টাকা দিয়ে ম্যানেজে ব্যার্থ হয়ে বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি দেখানোসহ চার্জশিট থেকে নিজের নাম বাদ দেয়ার চেষ্টা চালানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এতো কিছুর পরও আউয়াল ও তার বাহিনীকে দমাতে পারেনি তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

28 July 2026

প্রতারণা ও ভেলকিবাজির রাজা সাবেক এমপি আউয়াল