দুদকের মামলার আসামির পদায়ন বিতর্ক: আওয়ামী দোসর পুনর্বাসনে ক্ষোভ
- আপডেট এর সময় : ০৫:২৫:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 746
‘তিন বছরে ৬ কোটির বেশি টাকার মালিক কাস্টমস কর্মকর্তা’, ২০১৭ সালে এমন একটি সংবাদ বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হয় গুরুত্বের সঙ্গে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যত্যা পায় দুর্নীতি দমন কমিশন। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির মামলা এবং পরবর্তিতে জেলও খাটেন ওই কর্মকর্তা।
প্রায় ৯ বছর পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ওই কর্মকর্তার নাম। তিনি গোপালগঞ্জের টু্ঙ্গীপাড়া মহিলা লীগের সভানেত্রী ও শেখ হাসিনার বান্ধবীর জামাতা বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন।
একেতো দুর্নীতির মামলায় খেটেছেন জেল, তার ওপর আওয়ামী পরিবারের সদস্য; এমন একজন ব্যক্তিকে দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম কাস্টমসে পদায়ন জন্ম দিয়েছেন নানান প্রশ্নের।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোঃ আল আমীন ৩১তম বিসিএস (কাস্টমস) এর একজন কর্মকর্তা। তিনি ৩১তম বিসিএস ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে গত ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি যোগদান করেন। কদিন পরেই ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর সোনালী ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নিজ নামে ৮০ লাখ টাকার এফডিআর করেন তিনি। একই বছরের নভেম্বর মাসের ৪ তারিখ ও ১৬ তারিখে তার মা শরীফ হাসিনা আজিম ও তার বোন শরীফা খানমের নামে ৭৫ লাখ টাকা করে ২টি এফডিআর করেন। এসব এফডিআরে শতভাগ নমিনি নিজেকে রেখেছেন তিনি। দুদক সূত্রে আরো জানা গেছে, শরীফ মোঃ আল-আমীন অবৈধ উপায়ে দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত মোট ৬ কোটি ২৬ লাখ ১১ হাজার ২২২ টাকা তার নিজের ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে জমা করেন। জমা করা অর্থের মধ্যে তিনি ৪ কোটি ১২ লাখ ৫১ হাজার টাকা নগদ তুলে নেন। এরপর বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানে চলে এলে তৎকালীন সময়ে বাকি ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩১৭ টাকা আর তুলতে পারেননি। দুদকের অনুসন্ধানে আরো বেরিয়ে আসে, তৎকালীন সময়ে শরীফ মোঃ আল-আমীন পরিবারের জন্য ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় গাড়ি কেনেন। এ অপকর্মে সহযোগিতা করায় তিনিসহ তার মা, বোনসহ মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়।
তার নিজ এলাকা চিতলমারীতে খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয়রা জানান, শরিফ তামিজ উদ্দিন এর ছেলে শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন কাস্টমসের চাকরি হওয়ার পর ভাগ্য রাতারাতি বদলে যায়। খুব অল্প দিনেই আত্মীয়-স্বজন ও স্ত্রীর নামে গড়েন অটল সম্পদ। সঠিক ঠিকানা দিতে না পরলেও তারা বলেন, ঢাকা, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় স্ত্রীর নামে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন আল আমিন। শ্বশুর বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়ও কিনেছেন জমি। তারা আরও জানান, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বান্ধবী তার শাশুড়ি। এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছেন তিনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার সংবাদ প্রচারের পর অনেকটা বাধ্য হয়েই দুদকের মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর শাশুড়ির ক্ষমতায় খুব অল্প সময়ে বীর দর্পেই কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
কাস্টম হাউজের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আল আমিন বিগত দিনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় সবার ওপরেই ছড়ি ঘোরাতেন। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল করে নিজের ইচ্ছে মতো করেছেন ঘুষ বাণিজ্যে।আমদানিকারকদের সাথে যোগসাজশ করে পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া। এইচএস কোড জালিয়াতি বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা পণ্য দ্রুত খালাস করে দেওয়ার বিনিময়ে বড় অংকের কমিশন বাণিজ্যে মাহির ছিলেন তিনি। দুদকে মামলা হলেও শাশুড়ি শেখ হাসিনার বান্ধবী হওয়ার সুবাদে বিষয়টি কৌশলে ধামাচাপা দেয়া হয়। উল্টো চাকরি জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। আওয়ামী লীগের পতনের পর বেশ মোটা অঙ্কর টাকার বিনিময়ে আল আমিন চট্টগ্রামে পোস্টিং নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন অনেকে। এসময় বর্তমান সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে আওয়ামী দোসরদের মদদ দেয়া কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা আরও বলেন, বিগত ১৭ বছর যারা বিঞ্চত ছিলো, আজও তারা বঞ্চিতই রয়ে গেছে। বিগত দিনে আওয়ামী লীগের লেবাসে যারা দুহাতে টাকা কামিয়েছে, তারা আজ সেই টাকার বিনিময়ে নিজেদের সুযোগ সুবিধামতো স্থানে পদায়ন ও পদন্নতি নিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন বলেও অভিযোগ ক্ষুব্ধ এসব কর্মকর্তার।
তাদের দাবি, আওয়ামী দোসর ও দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসন নয়, হোক সততা আর নিষ্ঠার জয়।




















