১০:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নজিরবিহীন অরাজকতা, নিয়োগ বাণিজ্য ও সচিবের রহস্যজনক তদবিরে ডুবছে জাগৃক

Jakir Hossain
  • আপডেট এর সময় : ০৯:৩৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • / 575

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম দীর্ঘ ৯ মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, সাবেক চেয়ারম্যানকে স্বপদে বহাল রাখতে মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামের বিতর্কিত তদবিরের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত নয় মাসে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আর্থিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের আমলে নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি, যা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ফাইল ‘তদন্তের’ নামে বারবার আটকে রাখা, সাধারণ গ্রাহকদের ছোটখাটো কাজের জন্য সরাসরি চেয়ারম্যানের দফতরে উপস্থিত হতে বাধ্য করা, যা সুশাসনের পরিপন্থী।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে , সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আলমগীর হোসাইন ও নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বিপুল অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া।

শুধু তাই নয়, নিয়োগপ্রাপ্ত ড্রাইভারদের গাড়ি চালানোর প্রাথমিক দক্ষতা নেই এবং অফিস সহকারী/কম্পিউটার অপারেটররা কম্পিউটারের সাধারণ জ্ঞানটুকুও রাখেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা (Practical Test) সঠিকভাবে নেওয়া হয়নি বলেও জানান সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সরাফত হোসেনকে ‘ডাবল প্রমোশন’ দিয়ে মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেয়ার বিষয়টি সংস্থার ভেতর ও বাইরে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশের মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হওয়ার পরেও সচিব নজরুল ইসলাম কেন সাবেক চেয়ারম্যানকে রাখার জন্য তদবির করছেন। যা নিয়ে সবার মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটি কি কেবল প্রশাসনিক সখ্যতা, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো আর্থিক স্বার্থ জড়িত?
সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম এবং সচিব নজরুল ইসলামের যোগসাজশে ধানমন্ডির একটি মূল্যবান প্লটকে ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে জাল নথির মাধ্যমে ব্যক্তিবিশেষের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ ও ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পূর্বে প্রধান কার্যালয় থেকে প্লট বা ফ্ল্যাটের কাগজপত্র যাচাইয়ের সু্যোগ থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ প্রায়। এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু সাব-রেজিস্ট্রার মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে একজনের প্লট বা ফ্ল্যাট অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন। অথচ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) এই জালিয়াতি রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সংস্থার অবৈধ দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধারে সাবেক চেয়ারম্যানের ভূমিকা ছিল রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে মিরপুর-১ এর ‘স্বাধীন বাংলা মার্কেট’ এর জায়গাটি এর বড় প্রমাণ। গত বছরের নভেম্বর মাসে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হওয়া সত্ত্বেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদ বন্ধ রাখার বিনিময়ে অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে সচিব নজরুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের প্লট রেকর্ড যাতে সংশোধন না হয়, সেজন্য একটি বিশেষ চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এই অনৈতিক কাজে তাকে সরাসরি প্রশাসনিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন সচিব নজরুল ইসলাম।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন চেয়ারম্যান (মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান) নিয়োগ দিলেও সচিব নজরুল ইসলাম তা কার্যকর হতে দিচ্ছেন না। আগামী জুন ২০২৬-এ অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফেরদৌসী বেগমকেই এই পদে রাখার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে লবিং করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা ছাড়া একজন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে রাখতে সচিবের এই নজিরবিহীন আগ্রহের কারণ কী?

16 September 2026

নজিরবিহীন অরাজকতা, নিয়োগ বাণিজ্য ও সচিবের রহস্যজনক তদবিরে ডুবছে জাগৃক

আমাদের ফেইসবুক পেইজ

abc

নজিরবিহীন অরাজকতা, নিয়োগ বাণিজ্য ও সচিবের রহস্যজনক তদবিরে ডুবছে জাগৃক

আপডেট এর সময় : ০৯:৩৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম দীর্ঘ ৯ মাস অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, সাবেক চেয়ারম্যানকে স্বপদে বহাল রাখতে মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামের বিতর্কিত তদবিরের বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত নয় মাসে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আর্থিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের আমলে নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি, যা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সেবাগ্রহীতাদের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ফাইল ‘তদন্তের’ নামে বারবার আটকে রাখা, সাধারণ গ্রাহকদের ছোটখাটো কাজের জন্য সরাসরি চেয়ারম্যানের দফতরে উপস্থিত হতে বাধ্য করা, যা সুশাসনের পরিপন্থী।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে , সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আলমগীর হোসাইন ও নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বিপুল অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া।

শুধু তাই নয়, নিয়োগপ্রাপ্ত ড্রাইভারদের গাড়ি চালানোর প্রাথমিক দক্ষতা নেই এবং অফিস সহকারী/কম্পিউটার অপারেটররা কম্পিউটারের সাধারণ জ্ঞানটুকুও রাখেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা (Practical Test) সঠিকভাবে নেওয়া হয়নি বলেও জানান সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে মাদকাসক্ত হিসেবে পরিচিত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সরাফত হোসেনকে ‘ডাবল প্রমোশন’ দিয়ে মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেয়ার বিষয়টি সংস্থার ভেতর ও বাইরে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশের মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হওয়ার পরেও সচিব নজরুল ইসলাম কেন সাবেক চেয়ারম্যানকে রাখার জন্য তদবির করছেন। যা নিয়ে সবার মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এটি কি কেবল প্রশাসনিক সখ্যতা, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো আর্থিক স্বার্থ জড়িত?
সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম এবং সচিব নজরুল ইসলামের যোগসাজশে ধানমন্ডির একটি মূল্যবান প্লটকে ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে জাল নথির মাধ্যমে ব্যক্তিবিশেষের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ ও ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পূর্বে প্রধান কার্যালয় থেকে প্লট বা ফ্ল্যাটের কাগজপত্র যাচাইয়ের সু্যোগ থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ প্রায়। এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু সাব-রেজিস্ট্রার মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে একজনের প্লট বা ফ্ল্যাট অন্যজনের নামে রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন। অথচ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) এই জালিয়াতি রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সংস্থার অবৈধ দখলকৃত সম্পত্তি উদ্ধারে সাবেক চেয়ারম্যানের ভূমিকা ছিল রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে মিরপুর-১ এর ‘স্বাধীন বাংলা মার্কেট’ এর জায়গাটি এর বড় প্রমাণ। গত বছরের নভেম্বর মাসে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ হওয়া সত্ত্বেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদ বন্ধ রাখার বিনিময়ে অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে সচিব নজরুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের প্লট রেকর্ড যাতে সংশোধন না হয়, সেজন্য একটি বিশেষ চক্রের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এই অনৈতিক কাজে তাকে সরাসরি প্রশাসনিক সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন সচিব নজরুল ইসলাম।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন চেয়ারম্যান (মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান) নিয়োগ দিলেও সচিব নজরুল ইসলাম তা কার্যকর হতে দিচ্ছেন না। আগামী জুন ২০২৬-এ অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফেরদৌসী বেগমকেই এই পদে রাখার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে লবিং করছেন। প্রশ্ন উঠেছে, ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা ছাড়া একজন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে রাখতে সচিবের এই নজিরবিহীন আগ্রহের কারণ কী?

16 September 2026

নজিরবিহীন অরাজকতা, নিয়োগ বাণিজ্য ও সচিবের রহস্যজনক তদবিরে ডুবছে জাগৃক