রমজানে সবাই করে সংযম, আমরা করি কি? :সম্পাদকীয়
- আপডেট এর সময় : ০১:৩৫:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / 102
কদিন বাদেই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। সিয়াম সাধানার মাস। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এই মাসটি বেশ গুরত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির আশায় বিশ্বময় মুসলমানরা এই মাসে সিয়াম সাধনা করেন। রোজা রেখে ইবাদত-বন্দেগীতে মহান আল্লার সন্তুষ্টি প্রার্থনা করেন।
রমজান মাসে সিয়াম সাধনা মানে শুধু ইবাদতই নয়, সবকিছুতে সংযমই হলো সিয়াম সাধনা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। রমজান মানেই নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর খড়গ। দ্রব্যমূল্যে চাপে দিশেহারা হওয়ার মাস।
সৌদি আরবসহ বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। রোজাদারদের জন্য আয়োজন করা হয় বিনামূল্যের ইফতার। শুধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নয়, বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতেও রমজান মাসে মুসলমানদের জন্য কমদামে পণ্য বিক্রি, বিনামূল্যে ইফতার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
অথচ বাংলাদেশে রমজান মাস মানেই এক শ্রেণীর মানুষের বাড়তি টাকা আয়ের জমজমাট ব্যবসা। এ মাসেই রোজার পণ্য সামগ্রীর দাম হু হু করে বাড়ে। প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূ্ল্য থাকে আকাশ সমান। রোজার অন্যতম অনুসর্গগুলো নিয়ে চলে বাড়তি লাভের নোংরা প্রতিযোগিতা। সংযম দুরের কথা উল্টো মুনাফালোভী এক শ্রেণির অসাধু চক্রের কড়াঘাতে নিম্ন আয়ের মানুষের পদদলিত হওয়ার মাস হয়ে ওঠে রমজান।
যেমন ধরুন, বছরের অন্যান্য সময়গুলোতে লেবুর দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা হালি বিক্রি হয়। কিন্তু রোজার মধ্যে এই লেবু্ই বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কোন কোন সময় ৮০ টাকা হালি। এছাড়া চিনি ও গুড়ের দাম নিয়ে চলে ছিনিমিনি। রোজার আরেক অনুসর্গ বেগুনি। এই বেগুনি হয় বেগুন থেকে। সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সেখানেও চড়া দাম হাঁকে ব্যবসায়ীরা। বেগুনের আগুনে দিশেহারা হতে হয় সবাইকে। বিগত বছরগুলোতে এই বেগুনি নিয়ে বেশ রং তামাশাও হয়েছে। সংসদেও উঠেছিলো বেগুনি প্রসঙ্গ। এছাড়া ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বিভিন্ন প্রকাল ফলসহ কমবেশি সব পেণ্যর দাম অন্যান্য সময়ের চেয়ে বাড়তি থাকে রমজান মাসে।
ঘাম ঝরানো টাকায় তাই সাধ থাকলেও সন্তানের মুখে এক টুকরো ফল অথবা একটু ভালো খাবার তুলে দেয়া অসাধ্য হয়ে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য।
শুধু বাজার নয়, সংযমের মাসে ইফতার আয়োজন নিয়েও চলে এক প্রকার প্রহসন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো রমজান মাসজুড়ে বাংলাদেশেও রোজাদারদের জন্য বিনামূল্যে ইফতার আয়োজন থাকে। তবে তা কোন না কোন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনও ইফতার আয়োজন করে। বিতরণ করা হয় ইফতার ও রোজার সামগ্রী। তবে সেখানেও দেখা যায় প্রচারণার এক ভিন্ন মাত্রার প্রতিযোগিতা।
আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের স্বৈরসাশনের পতনের পর থেকে অস্থিরতা বিরাজ করছে বাজারে। এর মাঝে এলো রমজান। তাই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কপালে চিন্তার ভাজ। যেখানে এতো দিনেও অন্তর্বর্তী সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, সেখানে রমজান মাসে কি পরিস্থিতি হবে, সেই শঙ্কা তাদের।
সমাধানের পথ: সরকারের ভূমিকা
বিগত কয়েক মাস ধরেই সরকারের পক্ষ থেকে বল হচ্ছিলো রমজানে নিত্যপণ্যের সংকট হবে না। পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে প্রতিটি পণ্যের। এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিও করা হয়েছে নিত্যপণ্য।
খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার শুরু থেকেই বলে আসছেন, রমজানের জন্য সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতির কথা। সংকট দুরের কথা উল্টো পর্যাপ্ত মজুদের কথা বেশ ঢাক ঢোল পিটিয়েই বলে আসছেন তিনি।
আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য বাড়বে না বলে বেশ জোর গলায় বলে আসছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনও। দেশে আমদানি ব্যবস্থা ও মজুত যথেষ্ট আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন ইনশাআল্লাহ রমজান উপলক্ষে কোনো সমস্যা হবে না। তেল, চিনি, ছোলা ও খেজুরের কোনো সংকট বাজারে নেই। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের যে দাম দেখি, দেশের বাজারে তাতে দাম কমার কথা। দাম বাড়ার কোনো কারণ দেখি না।এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো রমজান মাসজুড়ে প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্য খোলা বাজারে কম দামে বিক্রি ও বিতরণের উদ্যোগের কথাও জানান বাণিজ্য উপদেষ্টা।
সরকারের উপদেষ্টাদের কথায় কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইছে সাধারণ মানুষের মনে। তবে সচেতন মহল বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি বাজার মনিটরিং ছাড়া রমজান মাসে কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি।
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তারা জানান, সরকার যদি খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
প্রথমত, সরকার বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করতে পারে এবং যদি কোনো পণ্যের সংকট দেখা দেয়, তাহলে তার যথাযথ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়া, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা উচিত, যাতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মানুষের দুরবস্থা কাজে লাগিয়ে দাম বৃদ্ধি করতে না পারে।
সরকারি ভর্তুকি এবং কমমূল্যে খাদ্য বিতরণের উদ্যোগ নিতে পারে, বিশেষ করে দরিদ্র জনগণের জন্য। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের খাদ্য সংক্রান্ত চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
নতুন উদ্যোগ ও সমাধান
বাজার ব্যবস্থার উন্নতি, প্রান্তিক জনগণের জন্য ভর্তুকি কার্যক্রম এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ রমজান মাসে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। পাশাপাশি, সামাজিক সংগঠনগুলো এবং স্থানীয় প্রশাসনও রমজান উপলক্ষে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য খাদ্য সাহায্য কার্যক্রম চালাতে পারে।
তবে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হওয়া এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে সহানুভূতিশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। একে অপরকে সহযোগিতা করে, বাজারে সুষ্ঠু ও ন্যায্য পরিস্থিতি তৈরির জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
রমজান মাসে বাজার পরিস্থিতি এবং দাম বৃদ্ধি নিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের উদ্বেগ একটি গুরুতর সমস্যা। তবে, সরকারের সদিচ্ছা এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একত্রিত হয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে, যাতে রমজানের পবিত্রতা ও তার চেতনা সবার জীবনকে স্পর্শ করতে পারে। সংযমের মাসে সংযমই হোক মূল লক্ষ্য, মুনাফালোভীদের প্রতিহত করে সবাই ব্রত থাকুক সিয়াম সাধনায়।




















